রাজধানীতে দুর্ভোগ চরমে পাম্পে পাম্পে লাইন, ক্লান্ত মানুষ
জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে রাজধানীতে জনদুর্ভোগ এখন চরমে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে একই চিত্র। দীর্ঘ লাইন, ক্লান্ত অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত তেল। সোমবার সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এই সংকট শুধু সড়কে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কর্মঘণ্টাতেও গভীর প্রভাব ফেলছে।
বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের সারি মহাখালী রেলগেটে পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। কেউ দুই ঘণ্টা, কেউ চার, আবার কেউ পাঁচ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন। এখানে তেল মিললেও অপেক্ষার ধকল সামলানোই যেন বড় চ্যালেঞ্জ।
গাজীপুরার বাসিন্দা আলামিন হোসেন ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে এসে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। তিনি বলেন, আগে ২০০-৩০০ টাকার তেল নিলেই চলত। এখন সবাই ফুল ট্যাংক করতে চায়। তাই ভিড় বাড়ছে। তিনি জানান, একটি কোম্পানিতে চাকরির পাশাপাশি রাইডশেয়ারিং করেন। প্রতিদিন প্রায় ৮০ কিলোমিটার গাড়ি চালাতে হয়। তাই নিয়মিত তেল নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ থাকলেও অতিরিক্ত চাপের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম বলেন, তেল দিচ্ছি নিয়মিত। তারপরও লাইন কমছে না।
আবুল কালাম, আব্দুল জলিল ও রেজাউর রহিম নামে তিন বাইকচালক জানান, এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরতে ঘুরতেই তাদের মোটরসাইকেলের অবশিষ্ট তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারপরও নিশ্চিতভাবে কোথাও তেল মিলবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
মৎস্য ভবন এলাকার রমনা পেট্রোল পাম্পে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সেখানে তেল দেওয়া হচ্ছে, তবে সীমিত। প্রতিটি মোটরসাইকেলে ৫০০ টাকা ও প্রাইভেটকারে সর্বোচ্চ ১৫০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাদের ট্যাংকে তেল আছে, তারাও লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ১০০-২০০ টাকার তেল দিলেই তাদের গাড়ির ট্যাংকি ফুল হয়ে যাচ্ছে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, অধিক মুনাফার আশায় এক শ্রেণির অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। কোথাও কোথাও তেল থাকার পরও বিক্রি বন্ধ রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মিরপুর, শেওড়াপাড়া ও তালতলা এলাকায় সকাল থেকেই ছিল উপচেপড়া ভিড়। শেওড়াপাড়ার হাসান ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, লাইনের শেষ অংশ প্রধান সড়ক ছাড়িয়ে গেছে। একটি পাম্পে তেল না পেলে অন্য পাম্পে ছুটছেন গ্রাহকরা। সেখানেও একই দীর্ঘ অপেক্ষা। রোদে পুড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক চালক জানান, সকাল থেকে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল মেলেনি। কেউ কেউ রাস্তার পাশেই নাস্তা ও দুপুরের খাবার সারছেন। অফিসের সময় পেরিয়ে গেলেও মিলছে না সমাধান।
দেখা গেছে, শ্যামলীর খালেদ সার্ভিস স্টেশনের সামনের সারি গিয়ে ঠেকেছে আসাদগেট মোড় পর্যন্ত। এখানে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে। প্রাইভেটকারে ১৫-২০ লিটার, মোটরসাইকেলে ৩০০ টাকার বেশি তেল মিলছে না। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সন্তানকে স্কুলে দিয়ে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। দুই ঘণ্টা পার হলেও এখনো পাম্পে পৌঁছাতে পারিনি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে সাইনবোর্ড ও ঢাকা-মাওয়া সড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে জুরাইন সড়কের দুইপাশে পাম্প ঘুরে দেখা যায়, মোটরসাইকেল আরোহী ও প্রাইভেটকার মালিক ও চালকরা তেলের জন্য পাম্পে পাম্পে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। পাম্পের ম্যানেজার, ক্যাশিয়ার, কর্মচারীদের কাছে তেল পেতে অনুনয়-বিনয় করছেন। কোনো এক পাম্পে তেল দিচ্ছে শুনলেই সেখানে যাচ্ছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তেল নেওয়ার সময় পাম্প কর্মচারীদের বাড়তি বকশিশ দিয়ে বাড়তি তেল নিতেও দেখা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল পাম্প মালিক ও কর্মচারীদের টেলিফোন করে এবং নিজের পরিচয় দিয়ে বাড়তি তেল নেওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।
সোমবার যাত্রাবাড়ী ইউনাইটেড ক্যাব লিমিটেডে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। তেল দেওয়ার খবর পেয়ে একের পর এক মোটরসাইকেল লাইনে যুক্ত হচ্ছে। লাইনে দাঁড়ানো ইরফান হোসেন বলেন, আমি ঢাকার গুলিস্তানসহ বেশ কয়েকটি পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখে চলে এসেছি। এই পাম্পেও একই অবস্থা। উপায় না পেয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছি। ৪০ মিনিট হয়েছে। আমার সামনে আরও ৫০ জন আছে। জানি না শেষ পর্যন্ত তেল নিয়ে যেতে পারি কি-না।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন যাত্রাবাড়ী, তেজগাঁও ও সবুজবাগ প্রতিনিধি)
